“সেই কালো টেলিফোন সেট “
হৃদয় দ্রবীভূত করে দেয়া এই গল্পটি দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা কোনো খেয়া নৌকার নষ্ট হয়ে যাওয়া পুরোনা কাঠের মতো পুরোনো । আমি তখন নিতান্তই ছোট। বয়স ছয় কিংবা সাত। এলাকা জুড়ে শুধুমাত্র একটা টেলিফোন সেট । আমার হাতের নাগালের বাইরে এই কালো টেলিফোন সেটে বাবা-মা কথা বলেন। অবাক বিস্ময়ে খেয়াল করি- আলাদীনের আশ্চর্য্য প্রদীপের জ্বিনের মতো এক অদেখা মানবী এই টেলিফোন সেটের ভিতরে লুকিয়ে আছেন।টেলিফোন সেট ওঠিয়ে মা কারো নাম্বার, কারো ঠিকানা এসব জানতে চাইলে এই অদেখা মানবী সব বলে দেয়।
একদিন ঘরে বাবা মা নেই। হাতুড়ি দিয়ে টুকাটুকি করতে গিয়ে আমার আঙ্গুলে ভীষণ চোট লাগে। কিন্তু , কেঁদে লাভ কি। আমার কান্না দেখার মতো তো ঘরে কেউ নেই। হঠাৎ আমার ফোনের ভিতর লুকিয়ে থাকা এই অদেখা মানবীর কথা মনে হয়। চেয়ার টেনে ফোনের রিসিভারটি হাতে নেই। কয়েকটা নাম্বার এদিক ওদিক ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে বলে – কোনো সাহায্য চাই? জ্বি। আমার আঙ্গুলে খুব চোট পেয়েছি। ভীষণ ব্যথা করছে। রক্ত বের হচ্ছে। না।বাড়িতে কেউ নেই। না, আমি একা। বাবা-মা দুজনেই খালার বাসায় বেড়াতে গেছেন।
এক কাজ করো। তুমি ফ্রিজ খুলে কোনো বরফ পাও কিনা দেখো। সেটা যেখানে আঙ্গুল ব্যথা করছে। সেখানে লাগিয়ে রাখো। ভালো লাগবো। এতো দরদ দিয়ে উনি কথা গুলো বললেন- এবার আমি ফুঁফাতে থাকি। এরপর যখনই কোনো সমস্যায় পড়ি- ফোনে ডায়াল করলেই উনি হাজির হয়ে জানতে চান- কোনো সাহায্য চাই? আমার কত কিছু জানার আছে। পিরামিড কোথায়? ইজিপ্ট বানান কেমন করে করতে হয়? রাতে পাখিরা নীড়ে ঘুমায়। প্রজাপতিদের নীড় কোথায়?
একদিন ঘুম থেকে জেগে দেখি- পালকের ভিতরে আমার প্রিয় পোষা পাখিটির নিথর দেহ। দুঃখে বুকটা খাখা করে। পাখিটার মৃত্যুতে আমার গভীর ব্যথার কথা উনাকে বলি। উনি কত কথা বলেন। কিন্তু কিছুতেই আমার দুঃখ লাঘব হয়না। রোদন করে আমি বলতে থাকি- এতো সুন্দর করে পাখিটা গান গাইতো। কেন ও মরে গেলো। একথা শুনার পর উনি এমন একটা কথা আমাকে বলেন- যা আমার ছোট মনটাকে একেবারে শান্ত করে দেয়। উনি বলেন- দেখো পাখিটা কি শুধু তোমাকেই গান শুনাবে। সে এখন অন্য জগতে চলে গেছে। সেখানেও যে ওকে তোমার মতো অন্য কাউকে গান শুনাতে হবে।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। একদিন স্কুল থেকে ঘরে ফিরে দেখি- আমাদের বাসার চারপাশে মানুষের ভীড়। বাবা নেই। বাবা ঘরে ফিরার আগেই এক পলকের মাঝে একটা ট্রাক বাবার শরীরটাকে একেবারে চূর্ণ করে দিয়ে গেছে। আমার হৃদয়টা বিদীর্ণ হয়। মা গভীর দুঃখে পাথর হন। দিনে দিনে বুঝতে পারি-জীবনে সুখের স্পন্দন আর দুঃখের ক্রন্দন, সাজানো সংসার আর গ্লানিময় সংহার, এই জীবন আর পরজীবনের দূরত্ব শুধু এক পলক। কে যে কখন পাখি হয়ে যায়- আমরা কেউ জানিনা।
বহমান সময় থেমে থাকেনা। আমরাও দিন দিন শুধু গরীর হতে থাকে। খরচ বাঁচাতে শহর ছাড়তে হলো । ছাড়তে হলো সেই কালো ফোন সেট। মায়ের সুখী চেহারায় পড়েছে- জীবন সংগ্রামের চাপ। মাকে ঘরে এবার একা রেখে আমাকেও উচ্চ শিক্ষার জন্য রাজধানী আসতে হলো। মাঝে মাঝে স্মৃতির ভিতর থেকে সেই কালো টেলিফোন সেটটির কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই অদেখা মানবীর কথা। এখন বুঝতে পারি- শহর জুড়ে হাতে গোনা অল্প কিছু সংখ্যক ফোনের যাবতীয় সংযোগে ঘটাতে তিনিই ছিলেন শহরে জুড়ে একমাত্র অপারেটের ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ট্যুরে শৈশবের সেই স্মৃতির শহরে আসলে আমার দারুন এক কৌতুহল জাগে। একটা টেলিফোন সেট থেকে সেই নাম্বারে ডায়াল করি। আর, আমাকে অবাক করে দিয়ে সেই চির চেনা কন্ঠটি বলে ওঠে – কোনো সাহায্য চাই? আমি বলি- ইজিপ্ট কেমন করে বানান করতে হয়। আঙ্গুলে খুব চোট পেয়েছে। কি করি? উনি হেসে বলেন- তোমার চোট পাওয়া আঙ্গুলটি নিশ্চয়ই এতোদিন ভালো হয়ে গেছে। আমার কি যে ভালো লাগে উনার কন্ঠ শুনে। ঝরণার জলের মতো বুকের ভিতর থেকে থিরথির করে নানা কথা বের হতে থাকে। আমি উনাকে বলেই ফেলি – আমার শৈশবের স্মৃতির বিরাট জায়গা জুড়ে আপনি আছেন। একটা শিশুর জীবনকে এতো বৈচিত্র্য, এতো আনন্দময় করে তোলার জন্য আমি আপনার কাছে চির ঋণী। আমিও তোমার কাছে ঋণী।। জানো আমার কোনো সন্তান নেই। সন্তানের অপূর্ণতা তুমি অনেক দূর করে দিয়েছিলে । আমিও সব সময় কাজে এসে অপেক্ষা করতাম- কখন তোমার ফোন আসবে। কখন তোমার সাথে আমার কথা হবে। কতদিন তোমার ফোন পাওয়ার আশায় কাজে এসেছি। তারপর অপেক্ষার প্রহর শেষে শূণ্য হৃদয়ে ঘরে ফিরে গেছি। এই শহরে আসলে একবার আমাকে ফোন করো।
এরপর গাড়ীর চাকার মতো জীবনের চাকা ঘুরপাক খেতে খেতে মহাকালের পথে অনেক মাইল পার হয়ে গেছে। দালান কোটার ভিতর থাকলেও প্রতিট মানুষের জীবন আসলে ফুটো বেড়ার মতো। এখানে এক ফাঁক দিয়ে আশা ঢুকে , অন্য ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যায়। ফলে সবাই সবকিছু একসাথে পায়না । যেদিন আমার চাকুরি হলো- সেদিনই মা হাসপাতালে ভর্তি হলেন। অফিসের কাজ শেষ করে হাসপাতাল। হাসপাতালে মায়ের পাশে রাত কাটিয়ে অফিস।এই হাসপাতাল আর অফিস করতে করতেই – একদিন মা ও চলে গেলেন। কি যে এক গভীর ক্ষত তৈরি হলো। মানুষ বলে সময় নাকি সব ক্ষত নিরাময় করে দেয়। ভুল কথা। কিছু কিছু ক্ষত জীবনেও নিরাময় হয়না। ভাগ্য যে মানুষকে কোথায় টেনে নিয়ে যায়। বদলি হয়ে আসলাম আমার সেই শৈশবের স্মৃতির শহরে। অফিস ফোন থেকেই সেই নাম্বারে ডায়াল করি। এবার এক অপরিচিত কন্ঠ । আমি উনার কথা জানতে চাই। নতুন মহিলা বলেন- আপনার নামটা কি একটু দয়া করে বলবেন? আরিফ। আরিফ মাহমুদ। নাম বলার পর মহিলা বলেন- জ্বি আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনার কথা উনি কত বলেছেন। আমি কি উনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?
আমার কানে একটা দীর্ঘশ্বাস আসে। স্রোতের প্রচণ্ড ধাক্কায় যেমন নদীর পাড় ভাঙ্গে। ফোনের ভিতর থেকে আসা প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে আমার হৃদয়টা ভাঙ্গছে।
গভীর দীর্ঘশ্বাসে মহিলা বলেন- সেটাতো এখন আর সম্ভব না ভাই। গত তিন সপ্তাহ ধরে উনি খুবই অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থ থাকা অবস্থায় বারবার আপনার কথা বলেছেন। আর আপনার জন্য খামের ভিতর একটা নোট লিখে দিয়ে গেছেন। বলেছেন- যদি আপনার কখনো ফোন আসে- তবে এই নোটটি যেন আপনাকে পড়ে শুনাই। নোট শুনলেই নাকি আপনি সব বুঝতে পারবেন। “আবার যখন তুমি ফোন করবে- জানিনা, তোমার ফোন গ্রহণ করতে পারবো কিনা। যদি না পারি, তবে, আমার জন্য মন খারাপ করোনা । শুধু মনে রেখো- অন্য এক ভূবনে আমারও গান শুনাবার সময় হয়ে গেছে” ।
প্রবল অশ্রুপাতে ভেসে যাচ্ছে আমার দুচোখ। এই ক্ষুদ্র জীবনে আমরা সবাই এক ক্ষণিকের পাখি। চোখ দিয়ে কাঁদছি- আর হৃদয় দিয়ে ভাবছি- কারো জীবনের একটু ভালোবাসা, একটু সহানুভূতি, একটু দরদমাখা কথা মানুষের জীবনকে কী গভীর ভাবে স্পর্শ করে। সব মানুষই দেহ নিয়ে আসে আর একদিন পাখি হয়ে ওড়ে যায়। শুধু যাওয়ার আগে কোনো কোনো পাখি তার মায়ার পালকটি রেখে যায়। মায়া এণ্জেলোর সেই বিখ্যাত কথাটি আমার বুকের ভিতর অনুরণন করছে-
People will forget what you said, people will forget what you did, but people will never forget how you made them feel.
(লেখকের নাম ওজানা শাহিন আমাকে লেখাটা দিয়েছিল আমার ভিশন পছন্দের একটা লেখা। রেখে দিলাম, অনেক বছর পর আবারো পড়বো তাই।)
One Response
এই লেখককে আমি ফেসবুকে ফলো করতাম। ভীষণ ভালো লিখেন। সত্যি ভালো লাগছে আবার পড়ে।